About

History of Binapani Govt. Girls' High School

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের মধুমতি নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে নয়নাভিরাম গোপালগঞ্জ জেলা শহর। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ও নজরুলসঙ্গীত সম্রাজ্ঞী ফিরোজা বেগমের জন্মভূমি এই গোপালগঞ্জ। এছাড়াও বাংলাদেশের বহু কৃতি সন্তান জন্মগ্রহণ করেছেন তেরো নদী বিধৌত এই জেলায়।

প্রাচীনকালে এ এলাকাটি বঙ্গ অঞ্চলের অন্তর্গত ছিল। সুলতানী ও মোঘল যুগে এ অঞ্চল হিন্দু রাজারা শাসন করতেন। কোলকাতার জ্ঞানবাজার নিবাসী প্রীতিরাম দাস ১৮০০ সালে মকিমপুর পরগনা (বর্তমান বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার আওতায়) ১৯ হাজার টাকা দিয়ে কিনে নেন। ১৮০৪ সালে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র রাজচন্দ্র দাসের সাথে রাসমণির বিয়ে হয়। রানী রাসমণির স্বামী জমিদার রাজচন্দ্র দাস শিক্ষানুরাগী ছিলেন। তিনি মেয়েদের শিক্ষার অনগ্রসরতা দেখে গভীরভাবে অনুভব করেন যে শিক্ষা ছাড়া সমাজের উন্নতি কোনভাবেই সম্ভব নয়, বিশেষ করে নারী শিক্ষা ছাড়া তা আরও প্রায় অসম্ভব। তিনি আরও উপলব্ধি করলেন শিক্ষিত মা-ই সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে পারেন। তাঁরই উদ্যোগে শুরু হলো খাটরা এস্টেটে বিদ্যালয়ের সূতিকাগার এবং তিনি বিদ্যালয়ের জন্য একটি জমি দানপত্র করেন (বর্তমানে বীণাপাণি বিদ্যালয় )। কিন্ত মাত্র ৪৯ বছর বয়সে ১৮৩৬ খ্রীষ্টাব্দে তিনি মারা যান। জমিদার রাজচন্দ্র দাসের কোন পুত্র সন্তান না থাকায় তাঁর মৃত্যুর পরে রাণী রাসমণি সমস্ত এস্টেট অধিগ্রহণ করেন। কিন্তু মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে নানা মতপার্থক্যের কারনে মেয়েদের শিক্ষাদান পিছিয়ে পড়ে।

১৯০৯ সালে গোপালগঞ্জ মহকুমা গঠিত হয়ে ১৯২১ সালে শহরের মানে উন্নীত হলেও মেয়েরা শিক্ষার দিক থেকে অনগ্রসর থেকেই যায়। খ্রীস্টীয় ধর্মগুরু জিতেন্দ্রলাল সরকার (জে এল সরকার) বর্তমান সরকারী বঙ্গবন্ধু কলেজ রোডের পাশে খ্রীষ্টান মিশনারির একটি জায়গায় মহকুমা শহরে মেয়েদের প্রথম একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন যা ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান করা হত। এভাবে বেশ কিছুকাল অতিবাহিত হবার পর জমিদার রাজচন্দ্রের মৃত্যুর ৯৪ বছর পর তাঁর দেয়া জমির উপরে ১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দে মাতা বীণাপাণির নামানুসারে বর্তমান বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। জিতেন্দ্রলাল সরকারের বিদ্যালয়টি বন্ধ করে দেয়া হলে ছাত্রীরা বীণাপাণিতে পড়ার সুযোগ পায়। জিতেন্দ্রলাল সরকার নিজেও এই বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন।

শুরুতে বীণাপাণি স্কুলটি একটি ইংরেজি এল আকৃতির টিনের ঘরে ক্লাস নেয়া শুরু হয়েছিল, মাটিতে চাটাই বিছিয়ে, কাঠবোর্ডে চকখড়ি দিয়ে শিক্ষকেরা ক্লাস নিতেন। শিক্ষকদের বসবার জন্য একটি চেয়ার রাখা হত। শিক্ষার্থীদের বসার জন্য কোন বেঞ্চ, টেবিল, ছিল না। এসব ফার্ণিচার বানানোর পাশাপাশি ক্লাস চলতে থাকে। প্রথম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত থাকলেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল খুব নগণ্য, কোন কোন শ্রেণীতে একজনমাত্র শিক্ষার্থী ছিল। শিক্ষার্থী যোগাড় করার জন্য শহরের সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলারা সন্ধ্যায় টর্চ জ্বালিয়ে বাড়ী বাড়ী যেতেন। উল্লেখ্য যে, সে সময় গোপালগঞ্জে বিদ্যুৎ এর কোন ব্যবস্থা ছিল না। বিদ্যালয়কে টিকিয়ে রাখতে প্রাইমারী শাখায় ছেলে মেয়ে উভয়কে তখন ভর্তি করা হত। এভাবেই একসময় মেয়েদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে বিদ্যালয়টি শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য গড়ে ওঠে।

১৯৭০ সালে স্কুলটি সরকারীকরণ করা হয়। উল্লেখ্য লোক মুখে শ্রুত যে, ১৯৬২ সালে গোপালগঞ্জে জনাব ওয়াহিদুজ্জামান তৎকালীন পাকিস্তানের বানিজ্যমন্ত্রী হলে তিনি তাঁর মা আকরামুন্নেছার নামে বিদ্যলয়ের নাম পরিবর্তন করেন। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে জাতীয়করণের সময় বীণাপাণি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতীয়করণ করার পর একতলা বিশিষ্ট দুটি ভবন নির্মিত হয় এবং পরবর্তীতে আসন সংখ্যা বৃদ্ধি করে আরেকটি দুইতলা ভবন নির্মিত হয়।

শুরুতে বিদ্যালয়ে ছিল একটি প্রশস্ত খেলার মাঠ, একটি নয়নাভিরাম শানবাঁধানো পদ্ম পুকুর যা ছিল এই বিদ্যালয়ের সবচেয়ে সৌন্দর্যময় দিক। পুকুরের পাড় ঘেঁষে ছিল নারকেল ও চালতা গাছ। উল্লেখ্য যে, সে সময় বিদ্যালয়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্য এবং পরিবেশকে নির্মল রাখার জন্য প্রচুর গাছ লাগানো হত। ভবনের দেয়াল ঘেঁষে ছিল আমলকি, নারকেল, খেজুর এবং ঔষধি গাছ। মূল ফটকে ঢুকতেই ছিল কাজলকালো আম গাছ, আর বকুলগাছ। প্রতি বছর এই আম গাছটির নীচে নানাধরনের অনুষ্ঠান হত। ঈদ-ই-মিলাদুন্নবী, পূজা উৎসব, বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নতুন শিক্ষক আগমন এমনকি বিদায়ী অনুষ্ঠান গুলো। কালের সাক্ষী হয়ে আম গাছটি এখনও উন্নতশির হয়ে স্কুলটির প্রতিনিধিত্ব করে চলেছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে থাকলে নয়নাভিরাম পদ্মপুকুর ভরাট করে সেইস্থানে আরেকটি নতুন দুইতলা ভবন তৈরী করা হয়েছে।

শিক্ষার মানের দিক থেকে বীণাপাণি বিদ্যালয় সরকারীকরণের পর থেকে প্রতিযোগিতামূলক লড়াইয়ে সফলতা লাভ করে চলেছে, পাশের হার প্রায় ৯৫%। ১৯৯৩ সালে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে মেয়েদের মধ্যে ৪র্থ এবং মেধা তালিকায় ৭ম স্থান। ২০০৮ সালে মানবিক বিভাগে মেধা তালিকায় ৫ম স্থান, ২০১০ সালে জেলা পর্যায়ে ব্যাটমিন্টনে চ্যাম্পিয়ান। মেধা বিকাশে ও খেলাধূলায় বিদ্যালয়ে নানামুখী শিক্ষা কর্মসূচি চালু রয়েছে। এই বিদ্যাপীঠ থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষার্থীরা দেশে বিদেশে স্বনামধন্য কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার সুযোগ লাভ করে থাকে। বর্তমানে বীণাপাণি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় গোপালগঞ্জ জেলার মাধ্যমিক স্তরে নারী শিক্ষার অপ্রতিদ্বন্দ্বী একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এটি গোপালগঞ্জ জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত।

৯২ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মত ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়ের একটি পুনর্মিলিনী অনুষ্ঠান হতে যাচ্ছে। সেইসাথে এক বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠার ৯২ বছর উদযাপন করা হবে। আগামী ২০ জানুয়ারি ২০২৩, শুক্রবার গোপালগঞ্জ জেলার মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে সাবেক শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে এই পুনর্মিলনীর দিন ধার্য করা হয়েছে। বীণাপাণি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক সকল শিক্ষার্থী (ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে) এবং ২০২২ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত এই পুনর্মিলনীতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

ওয়েবসাইটে একটি ফরম পূরণের মধ্য দিয়ে ব্যাংক একাউন্টে রেজিস্ট্রেশন ফি প্রদান করে পুনর্মিলনীর সদস্যপদ নিশ্চিত করবেন। এছাড়া বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন থেকে ফরম নিয়ে ব্যাংক একাউন্টে ফি জমা দিয়ে সদস্যপদ নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে।

অনুষ্ঠানকে সাফল্যমণ্ডিত করতে সকলের সহযোগিতা একান্তকাম্য।